মঙ্গলবার, ১৪ Jul ২০২৬, ১১:৫৬ পূর্বাহ্ন
সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই সংবাদ সম্মেলনে ‘রাজাকারের বাচ্চা’ ও ‘রাজাকারের নাতিপুতি’ আখ্যা দিয়ে কোটাপ্রথার পক্ষে অবস্থান নেন পতিত ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার ওই বক্তব্যের মাধ্যমে আন্দোলনকারীদের দমনের বৈধতা দেওয়া হয়। এর প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠেন শিক্ষার্থীরা। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। মধ্যরাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংস হামলা চালায় নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ।
সন্ধ্যায় শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারিত হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন আন্দোলন-সমর্থক শিক্ষার্থীরা। ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ’ নামে একটি ফেসবুক গ্রুপে প্রতিবাদের আহ্বান জানানো হয়। পরে বিভিন্ন হল থেকে শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা ‘চেয়েছিলাম অধিকার, হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘মেধা না কোটা, মেধা মেধা’ এবং ‘তুমি কে, আমি কে—রাজাকার, রাজাকার’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। বিক্ষোভে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক ছাত্রীও অংশ নেন।
প্রতিবাদ ঠেকাতে রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আটকাতে হলে হলে শিক্ষার্থীদের বের হতে বাধা দেয় ছাত্রলীগের ক্যাডাররা । শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে বের হতে শুরু করলে অনেক হলের ফটকে ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের আটকে রাখে। তাতেও শিক্ষার্থীদের বিক্ষুব্ধ স্রোত আটকাতে না পেরে মধুর ক্যান্টিনে জড়ো হতে থাকে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা।
এমন পরিস্থিতিতে ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কোনো ভূমিকা দেখা যায়নি। সাংবাদিকরা যোগাযোগের চেষ্টা করলেও প্রক্টর মাকসুদুর রহমানের মুঠোফোনে কল ঢোকেনি। বিক্ষোভ শেষে রাত দেড়টার দিকে শিক্ষার্থীরা হলে ফিরে যান। তবে কোটাবিরোধী আন্দোলনে সমর্থন জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তিন নেতা– মাছুম শাহরিয়ার, রাতুল আহামেদ শ্রাবণ ও আশিকুর রহমান জিম পদত্যাগ করেন।
শেখ হাসিনার কটূক্তির প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ বের করলে রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাটা পাহাড় সড়কে তাদের ওপর হামলা চালায়। শিক্ষার্থীরা কিছুক্ষণ পর কাটা পাহাড় সড়ক হয়ে শহীদ মিনারের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে আবারও তাদের ওপর হামলা হয়। এতে এক ছাত্রীসহ অন্তত দুজন আহত হন। আরো অনেককে মারধর করা হয়। পরে রাত ১টা পর্যন্ত ছাত্রলীগ ক্যাডাররা ক্যাম্পাসের জিরো পয়েন্টে অবস্থান করছিল।
এদিকে, ১৪ জুলাই রাত ১২টার দিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) শিক্ষার্থীরাও বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। তারা ক্যাম্পাস থেকে পুরান ঢাকার তাঁতীবাজার মোড় পর্যন্ত মিছিল করে আবার ক্যাম্পাসে ফিরে আসেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম সে সময় গণমাধ্যমকে বলেন, এটি তাদের সংগঠনের পূর্বঘোষিত কর্মসূচি ছিল না; শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিবাদে নেমেছেন। তবে আন্দোলনের সমন্বয়কদের রাজু ভাস্কর্যের বিক্ষোভে অংশ নিতে দেখা যায়।
রাষ্ট্রপতিকে আলটিমেটাম
কোটার যৌক্তিক সংস্কার এবং শাহবাগ থানায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে সেদিন সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেয় শিক্ষার্থীরা। ১৪ জুলাই ঢাকায় রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি প্রদান এবং গুলিস্তানে অবস্থান কর্মসূচি থেকে এই সময়সীমা ঘোষণা করা হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে দুপুর ১২টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গভবন অভিমুখে গণপদযাত্রা শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সামনে পুলিশ তাদের আটকানোর চেষ্টা করে। এরপর প্রেস ক্লাবের সামনে আবার পুলিশি বাধায় পড়ে মিছিলটি। পরে শিক্ষা ভবনের পাশ দিয়ে সচিবালয় পার হয়ে জিপিওর সামনে আবারও পুলিশ পদযাত্রায় ব্যারিকেড দেয়। প্রায় আধা ঘণ্টা সেখানে অবস্থান করেন আন্দোলনকারীরা। এক পর্যায়ে ব্যারিকেড ভেঙে গুলিস্তান মোড়ে চূড়ান্ত পুলিশি বাধায় পড়েন শিক্ষার্থীরা। সেখানে সাঁজোয়া যান, জলকামানসহ ব্যাপক পুলিশ অবস্থান নেয়। আন্দোলনকারীরা এ সময় স্লোগানে স্লোগানে রাজপথ প্রকম্পিত করে তোলেন। শেষ পর্যন্ত ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল পুলিশি নিরাপত্তায় বঙ্গভবনে গিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেন। প্রায় ২০ মিনিট পর তারা গুলিস্তান মোড়ে ফিরে আসেন।
এ সময় আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম জানান, রাষ্ট্রপতির কাছে তারা জরুরি সংসদ অধিবেশন ডেকে কোটা সংস্কার বিষয়ে আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আগামী ২৪ ঘণ্টায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখতে চাই। এছাড়া শাহবাগ থানায় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও অযৌক্তিক মামলা দেওয়া হয়েছে, তা প্রত্যাহার করতে হবে। না হলে কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।
ঢাকার বাইরেও তীব্র প্রতিক্রিয়া
একই দাবিতে দেশের বিভিন্ন জেলায় গণপদযাত্রা ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। পুলিশের বাধা পেরিয়ে শিক্ষার্থীরা গণপদযাত্রা করে চট্টগ্রামের ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) হাতে স্মারকলিপি দেন। সিলেটের জেলা প্রশাসকের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবি), সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ, মদন মোহন কলেজসহ অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। খুলনার জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) শিক্ষার্থীরা। রংপুরে পদযাত্রা কর্মসূচি পালন করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল কলেজ, রংপুর সরকারি কলেজ ও সরকারি বেগম রোকেয়া কলেজের শিক্ষার্থীরা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস থেকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পর্যন্ত গণপদযাত্রা করেন। এতে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ও রাজশাহী কলেজের শিক্ষার্থীরাও যোগ দেন। তারা রাজশাহীর জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি পেশ করেন।
ফরিদপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে ছাত্রদের ওপর পুলিশের হামলার বিচার চান সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ময়মনসিংহে আন্দোলনকারীরা পদযাত্রা কর্মসূচি পালন শেষে জেলা প্রশাসকের কাছে তাদের স্মারকলিপি দেন।
পটুয়াখালীতে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির বরাবর স্মারকলিপি দেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) শিক্ষার্থীরা। কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের হাতে স্মারকলিপি তুলে দেন আন্দোলনকারীরা। নেত্রকোনায়ও গণপদযাত্রা করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়। একই দাবিতে পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ থেকে পদযাত্রা শেষে পাবনা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন।
এ ছাড়া রংপুর, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, পটুয়াখালী, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও পাবনাসহ বিভিন্ন জেলায় একই ধরনের কর্মসূচি পালিত হয়। বরিশাল, কুমিল্লা, নোয়াখালী, বগুড়া, সুনামগঞ্জ, কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, নারায়ণগঞ্জ ও চাঁদপুরেও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেন শিক্ষার্থীরা। আন্দোলনের ১৪তম দিনে গণপদযাত্রা, স্মারকলিপি প্রদান এবং ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম ঘোষণার মধ্য দিয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে।